রচনা- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি।

রচনা- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি।

ভূমিকাঃ

ইনফরমেশন শব্দের বাংলা অর্থ হলো তথ্য। তথ্য পাওয়ার অধিকার একটি মানবাধিকার। বেঁচে থাকার জন্য আমাদের তথ্য প্রয়োজন। কোনো একটি বিষয় বিশ্লেষন করলে যে উপাত্ত পাওয়া যায়, উক্ত বিষয় সম্পর্কিত সেই উপাত্তই হলো তথ্য। অন্যদিকে, কমিউনিকেশন শব্দের বাংলা অর্থ হলো যোগাযোগ। কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর সাথে সংযোগ স্থাপন করে তথ্য-আদান প্রদান করাকে যোগাযোগ বলে। পূর্বে অর্থাৎ প্রাচীনকালে তথ্য পাওয়া বা সংগ্রহ করা এবং একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করা অত্যন্ত কঠিন এবং সময় সাপেক্ষের ব্যাপার ছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীদের ব্যাপক প্রচেষ্টায় তথ্য ও যোগাযোগকে প্রযুক্তির আওতায় এনে এক বিপ্লব সৃষ্টি করেছে। প্রযুক্তি হলো কোনো বিশেষ কৌশলের মাধ্যমে কোনো বিষয় বা বস্তুকে উন্নত করা। বর্তমান যুগ হলো তথ্য প্রযুক্তির যুগ, এই যুগে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির কল্যাণে এখন সারা বিশ্ব গ্লোবাল ভিলেজে রূপান্তরিত হয়েছে যেখানে একে অন্যের সাথে মুহূর্তের মাঝে যোগ্যোগ স্থাপন করা যাচ্ছে এবং তথ্য আদান প্রদান করা যাচ্ছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির গুরুত্বঃ

আমারা দৈনন্দিন জীবনে প্রায় সকল কাজের জন্যই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল। পূর্বে যে কাজ করা ছিল কষ্টসাধ্য এবং সময়সাপেক্ষ এখন উভয় কষ্টয় আমাদের লাঘব হয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির কল্যাণে। বেকার সমস্যা, চিকিৎসা সমস্যা, যোগাযোগ সমস্যা, প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি, তথ্য সেবা, গবেষণা কাজসহ এরকম আরো অসংখ্য কাজে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নিয়মিত ভূমিকা রেখে চলেছে এবং কোটি মানুষের জীবম, সময় ও শারীরিক কষ্ট লাঘব করে আসছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিঃ

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় প্রয়োগ শিক্ষাক্ষেত্রে হয়ে থাকে। শিক্ষার্থীরা তাদের পড়ালেখা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য ইন্টারনেট থেকে পেয়ে থাকে। অনেকে অনলাইন থেকে শিক্ষামূলক ভিডিও দেখে শিখতে পারে।করোনাকালীন সময়ে (২০১৯-২০২১) বিশ্বের বেশির ভাগ শিক্ষাকার্য অনলাইনে সম্পন্ন হয়েছে। যেমনঃ টিভিতে ক্লাস নেওয়া, জুম কিংবা অন্যান্য মাধ্যমে ক্লাস নেওয়া, ফেসবুক লাইভে ক্লাস নেওয়া ইত্যাদি। সামগ্রিক বিশ্ব জুড়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়নের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও সরাসরি শিক্ষা গ্রহনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রযুক্তি যেমন- প্রজেক্টর, লাউড স্পিকার ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কৃষিক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিঃ

তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক সম্প্রসারণের ফলে এখন তথ্য প্রযুক্তি কৃষিক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে। পূর্বে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে ফসল চাষ করতে অনেক সময় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতো। যেমনঃ কীট আক্রমণ, আগছা, খরা, রোগ বালাইয়ের জন্য ইত্যাদি। এখন প্রযুক্তির ব্যবহার ও কারণে উন্নত জাতের ফসল আবিষ্কারের পরে এ ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তি পাচ্ছে কৃষকেরা। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগ যেমনঃ কালবৈশাখী, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের হঠাৎ আক্রমনে কৃষকেরা ব্যাপক সমস্যার পড়ে থাকে। কিন্তু যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নতির কারণে এখন টেলিভিশন, রেডিও, খবরের কাগজ, ইটারনেট ইত্যাদির মাধ্যমে খুব দ্রুত খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আবহাওয়া জনিত কোনো দূর্যোগ আসলে তথ্য দ্রুত তা এসকল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষয় ক্ষতি হ্রাস পায়। এছাড়াও কৃষকের তাদের ফসল দিয়ে নিজেদের চাহিদা পূরণ করে তারা ফসল বিক্রি করে জীবিকা চাহিদা করে। যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই সকল ফসল শহরে রপ্তানি করে আয় করা সম্ভব হচ্ছে।

দূর্যোগ মোকাবেলায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিঃ

দূর্যোগ মোকাবেলায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের দেশে প্রধান প্রাকৃতিক দূর্যোগগুলো হলো বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলাবদ্ধতা, খরা ইত্যাদি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলাবদ্ধতার মতো প্রাকৃতিক দূর্যোগগুলোর ক্ষতি এড়ানোর জন্য উপকূলীয় এলাকাগুলোতে মাইকিং করা হয় বিভিন্ন সতর্ক সংকেত ব্যবহার করে। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থা তাদেত উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে ত্রাণ সেবা দিয়ে থাকে।

দুর্নীতি দমনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিঃ

আমাদের সমাজে প্রধান সামাজিক সমস্যা গুলোর মধ্যে দূর্নীতি একটি প্রধান সামাজিক সমস্যা। এর ফলে অনেক সাধারণ নানা কারণা এবং নানাভাবে সমস্যায় পড়ছে এবং অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবে দুর্নীতি দমনেও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ভূমিকা রেখে চলেছে। তথ্য প্রযুক্তির কারণে এখন দুর্নীতি করা সহজ না। এখন আধুনিক ব্যাংকে লেনদেন দ্রুত কতা যায়, কিন্তু সব হিসাব নিকাশ করার তথ্য সেভ থাকে। এছাড়া উইকিলিকসের মতো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কারণে মানুষ প্রথমবারের মতো দেশের বড় বড় দুর্নীতি সম্পর্কে জানতে পারছে। এখন যেকোনো দুর্নীতি করলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, তাই দুর্নীতি এখন তথ্য প্রযুক্তির কারণে অনেক হ্রাস পেয়েছে।

ব্যবসায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিঃ

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবসাক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত ভূমিকা রেখে চলেছে। তথ্য প্রযুক্তির ব্যবসায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ই-কমার্স। ই-কমার্সের মাধ্যমে ব্যবসা করে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। প্রথমত সম্পূর্ণ কাজ অনলাইনে। সুতরাং, কোনো ধরনের অবকাঠামোগত খরচ নেই। এছাড়া যোগাযোগ দ্রুত হয় এবং ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন দ্রুত এবং নিরাপদ থাকে। কম সময়ে ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব হয় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে। ঘরে বসেই বাণিজ্য এবং কেনা-কাটা করা যায় বিধায় এ ব্যবস্থা সাধারণ মানুষদের মাঝে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

চিকিৎসাক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিঃ

টেলিমেডিসিন সম্পর্কে আমরা সকলেই কম-বেশি পরিচিত। এটি হলো চিকিৎসা ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির একটি বিরাট অবদান। এর মাধ্যমে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ঘরে  বসেই যেকোনো ভালো ডাক্তারের কাছ থেকে উন্নতমানের চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। এমনকি টেলিমেডিসিন এর মাধ্যমে বিদেশি ডাক্তারের কাছ থেকেও চিকিৎসা নেওয়া যায়। চব্বিশ ঘন্টা এম্বুলেন্স সার্ভিসের কারণে এখন অনেক মূমুর্ষ রোগী দ্রুত এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা পেয়ে আরোগ্য লাভ করতে সক্ষম হচ্ছে।

যোগাযোগক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিঃ

যাত্রী নিয়ে আজ উড়োজাহাজ আকাশ পাড়ি দেয়, জলযান সমুদ্র পাড়ি দেয়, শত শত মাইল দূর থেকে মানুষ সংবাদ আদান-প্রদান করে টেলিগ্রাফ, টেলিপ্রিন্টার, টেলিফোন, ইন্টারনেট, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ইত্যাদির মাধ্যমে। আর এসবই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অবদান।

গবেষণাক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ
প্রযুক্তিঃ

গবেষণাক্ষেত্রেও তথ্য ও যোগাযোগ
প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষণায় প্রয়োজনীয় তথ্য ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা যায়। এছাড়াও বিভিন্ন গবেষণাপত্র জার্নালে প্রকাশ করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। গবেষণা করার জন্য জনপ্রিয় অনলাইন প্লাটফর্ম রয়েছে যার নাম ভার্চুয়াল ল্যাবরেটরি।

বিনোদনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিঃ

আমরা এই যুগে অনেক ধরনের মাল্টিপ্লেয়ার গেম খেলি যার ফলে আমরা অনলাইনে একাধিকজন একসাথে খেলতে পারি। এছাড়া ইন্টারনেট থেকে বিভিন্ন মুভি, গেম, মিউজিক, ড্রামা ইত্যাদি ডাউনলোড করে উপভোগ করতে পারি।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অপকারীতাঃ
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অনেক উপকারিতা থাকলেও কিছু অপকারিতা র‍য়েছে। এর পেছনে অনেক কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তাদের মূল্যবান সময় অপচয় করে। এছাড়া অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে তাদের চোখের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

উপসংহারঃ

পরিশেষে বলা যায়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ছাড়া আমরা অসহায়।  তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি হলো আধুনিক বিজ্ঞানের আশীর্বাদ স্বরূপ।
এটা আমাদের দায়িত্ব যে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির নিরাপদ এবং নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।

*

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post

Health

Blogger Templates